১৯ জুন ২০২৬

এক মুসলিম গণিতবিদের নাম যেভাবে বদলে দিল আধুনিক প্রযুক্তি

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬
এক মুসলিম গণিতবিদের নাম যেভাবে বদলে দিল আধুনিক প্রযুক্তি

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো অ্যালগরিদম শব্দের ইতিহাস। আমরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি, তথ্য অনুসন্ধান করি, ভিডিও দেখি কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করি। এসব ক্ষেত্রেই অদৃশ্যভাবে কাজ করে অ্যালগরিদম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বহুল ব্যবহৃত শব্দটির শিকড় লুকিয়ে আছে এক মুসলিম গণিতবিদের নামের মধ্যে। অ্যালগরিদম শব্দের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় বারোশ বছর আগের ইসলামি জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগে, যেখানে একজন অসাধারণ মনীষীর অবদান আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

বর্তমান সময়ে অ্যালগরিদম শব্দটি শুধু প্রযুক্তি নয়, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কোন সংবাদ দেখব, কোন ভিডিও আমাদের সামনে আসবে কিংবা কোন বিষয়ে আগ্রহী হব—এসব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে অ্যালগরিদম। অনেকের কাছে অ্যালগরিদম এখন রহস্যময় একটি ধারণা। কেউ কেউ এটিকে মানুষের চিন্তা ও মতামত নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবেও দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অ্যালগরিদম মূলত কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য ধাপে ধাপে সাজানো নির্দেশনার সমষ্টি।

এই ধারণার পেছনে যিনি সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন, তিনি হলেন মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি। তার নাম থেকেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ভাষাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে অ্যালগরিদম শব্দটি।

কে ছিলেন আল-খাওয়ারিজমি?
মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি ছিলেন নবম শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী। তিনি শুধু গণিতবিদই ছিলেন না; একই সঙ্গে ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ এবং গবেষক। তার জন্ম বর্তমান উজবেকিস্তানের আরাল সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত খাওয়ারিজম অঞ্চলে। তার নামের শেষাংশ “আল-খাওয়ারিজমি” এসেছে জন্মস্থানের নাম থেকে। সে সময় ইসলামি সভ্যতার জ্ঞানচর্চা বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধ অবস্থানে ছিল। বাগদাদের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা চলত, আর আল-খাওয়ারিজমি ছিলেন সেই জ্ঞানবিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

গণিতশাস্ত্রে তার অবদান এতটাই গভীর ছিল যে, আধুনিক গণিত ও গণনাবিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণে তার কাজ আজও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

অ্যালগরিদম শব্দের জন্ম কীভাবে?
আল-খাওয়ারিজমির লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ পরবর্তীকালে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। তার নামের ল্যাটিন রূপ ছিল “আলগোরিতমি”। ইউরোপের পণ্ডিতরা তার গণনা পদ্ধতি ও গাণিতিক নিয়ম বোঝাতে এই নাম ব্যবহার করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে শব্দটি ভাষাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ পেতে থাকে। ল্যাটিন থেকে ফরাসি এবং পরে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করে এটি বর্তমান অ্যালগরিদম শব্দে পরিণত হয়।অর্থাৎ আজ আমরা যে শব্দটি প্রযুক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছি, সেটি আসলে একজন মুসলিম বিজ্ঞানীর নামের বিবর্তিত রূপ।

আল-খাওয়ারিজমির বিপ্লব
আল-খাওয়ারিজমির সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান তার গণিতবিষয়ক গ্রন্থ। সেখানে তিনি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানকে সহজ ধাপে ভাগ করে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, কোনো সমস্যাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করলে সমাধান পাওয়া সম্ভব। এই ধারণাই পরবর্তীকালে অ্যালগরিদমিক চিন্তার ভিত্তি হয়ে ওঠে। বর্তমান কম্পিউটার যেভাবে ধাপে ধাপে নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ সম্পন্ন করে, তার মূল দর্শনের সঙ্গে আল-খাওয়ারিজমির চিন্তার বিস্ময়কর মিল রয়েছে।

বীজগণিতের জনক হিসেবে পরিচিতি
বিশ্ব ইতিহাসে আল-খাওয়ারিজমিকে প্রায়ই বীজগণিতের জনক বলা হয়। তার গবেষণা বীজগণিতকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।তিনি সমীকরণ সমাধানের বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং গাণিতিক যুক্তিকে আরও সংগঠিত রূপ দেন। আধুনিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বীজগণিত পড়ানো হয়, তার শিকড়ও অনেকাংশে তার কাজের মধ্যে নিহিত। বিজ্ঞান ইতিহাসবিদদের মতে, তার কাজ ছাড়া আধুনিক গণিতের বিকাশ কল্পনা করা কঠিন।

শূন্য ও সংখ্যা পদ্ধতির প্রসারে ভূমিকা
আল-খাওয়ারিজমির আরেকটি বড় অবদান হলো হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতির প্রসার। তিনি এমন এক সংখ্যা পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করেন, যেখানে শূন্যের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশ যে সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করে, তার বিস্তারে আল-খাওয়ারিজমির ভূমিকা ছিল অনন্য। শূন্য ছাড়া আধুনিক গণিত, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব হতো। এই কারণে তাকে শুধু একজন গণিতবিদ নয়, বরং মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

অ্যালগরিদম আসলে কী?
সহজ ভাষায় অ্যালগরিদম হলো কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট ধাপের সমষ্টি। একটি সমস্যা সমাধানের জন্য কী করতে হবে, কোন কাজের পরে কোন কাজ হবে—এসব নির্দেশনা অ্যালগরিদমের অংশ। উদাহরণ হিসেবে রান্নার একটি রেসিপির কথা ভাবা যেতে পারে। প্রথমে উপকরণ প্রস্তুত করা, এরপর নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো, তারপর নির্দিষ্ট সময় রান্না করা—সবই ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। অ্যালগরিদমও ঠিক একইভাবে কাজ করে। পার্থক্য হলো, এটি মানুষ বা যন্ত্রকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেয়।

আধুনিক প্রযুক্তিতে অ্যালগরিদমের ব্যবহার
আজকের পৃথিবীতে অ্যালগরিদম ছাড়া প্রযুক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। অনুসন্ধান ব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন কেনাকাটা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি—সবখানেই অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হচ্ছে। আপনি যখন কোনো তথ্য খোঁজেন, তখন অ্যালগরিদম সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ফলাফল খুঁজে দেয়। আপনি যখন ভিডিও দেখেন, তখন আপনার আগ্রহ অনুযায়ী নতুন ভিডিও সাজিয়ে দেয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে হাজার হাজার অ্যালগরিদমিক নিয়ম।

পথনির্দেশনা থেকে মহাকাশ অভিযান
অ্যালগরিদম শুধু তথ্যপ্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি নৌপরিবহন, ব্যবসা, জরিপ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ নির্ণয়, যানবাহনের দিকনির্দেশনা এবং মহাকাশযানের পথ নির্ধারণেও অ্যালগরিদম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের চাঁদে যাত্রার পেছনেও বিভিন্ন অ্যালগরিদমিক গণনা কাজ করেছে। ফলে এটি মানবসভ্যতার অগ্রগতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অ্যালগরিদম নিয়ে বিতর্ক কেন?
যদিও অ্যালগরিদম মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তবুও এটি নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম অনেক সময় ব্যবহারকারীদের একই ধরনের মতামত ও তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। এর ফলে মানুষ ভিন্নমত সম্পর্কে কম জানে এবং নিজস্ব বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি সমাজে বিভাজন বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে। তবে সমস্যা অ্যালগরিদমে নয়, বরং এর ব্যবহারের পদ্ধতিতে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে এটি মানবকল্যাণে বিশাল অবদান রাখতে পারে।

উপসংহার
অ্যালগরিদম শব্দের ইতিহাস আমাদের শুধু একটি শব্দের উৎপত্তির গল্প শোনায় না, বরং মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতাও তুলে ধরে। নবম শতাব্দীর মুসলিম বিজ্ঞানী আল-খাওয়ারিজমির গবেষণা আজকের ডিজিটাল বিশ্বের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে আমরা যে প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাস করছি, তার পেছনে রয়েছে শত শত বছরের জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবন।

অ্যালগরিদম সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই যখনই আমরা অ্যালগরিদম শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন অজান্তেই স্মরণ করি একজন মহান মুসলিম গণিতবিদের অসাধারণ অবদানকে, যিনি তার সময়কে অতিক্রম করে আজও বিশ্বকে পথ দেখিয়ে চলেছেন।

হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলছে চ্যাটজিপিটি! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এআই ট্রেন্ড

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬
হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলছে চ্যাটজিপিটি! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এআই ট্রেন্ড

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আগ্রহও বাড়ছে নতুন নতুন ব্যবহারে। চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই ভিন্ন এক কারণে আলোচনায় এসেছে ChatGPT।

সম্প্রতি অনেক ব্যবহারকারী নিজেদের ভবিষ্যৎ জানার জন্য এই এআই চ্যাটবটের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা নিজের হাতের ছবি আপলোড করে জ্যোতিষীর মতো বিশ্লেষণ পাচ্ছেন—যা নতুন এক কৌতূহল তৈরি করেছে।

OpenAI সম্প্রতি তাদের উন্নত ইমেজ মডেল উন্মুক্ত করেছে, যার মাধ্যমে ছবি বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত ভিজ্যুয়াল ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেকে হাতের রেখা বিশ্লেষণ করাচ্ছেন।

এআই মডেলটি হাতের ছবিতে বিভিন্ন রেখা শনাক্ত করে, সেখানে চিহ্ন বসিয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তুলে ধরছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক এমনকি ভবিষ্যৎ জীবন নিয়েও মন্তব্য যুক্ত করা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হচ্ছে কোনো পেশাদার জ্যোতিষীর অংশগ্রহণ ছাড়াই।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ ধরনের বিশ্লেষণকে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। কারণ, এআই সাধারণত এমন ভাষা ব্যবহার করে, যা অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য মনে হয়। ‘উদ্যমী’, ‘সংবেদনশীল’ বা ‘চিন্তাশীল’—এ ধরনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সহজেই মিল তৈরি করা হয়।

যদিও এই ফিচারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, অনেকেই এটিকে বিনোদন হিসেবেই দেখছেন। দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনা ও সহজবোধ্য ব্যাখ্যার কারণে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তিকে বাস্তব ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে কেবল কৌতূহল বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করছে ব্রিটেন

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬
১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করছে ব্রিটেন

১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। একই সঙ্গে প্রযুক্তি জায়ান্ট বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তিনি গেমিং এবং লাইভ-স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম এবং অপরিচিতদের সঙ্গে শিশুদের যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়া গেমিং সাইটগুলোর বিরুদ্ধে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্টারমার। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, ‌এই আমূল পরিবর্তন শিশুদের ‌‌‘‘শৈশব ফিরিয়ে দেবে।’’

তিনি বলেন, আমার কাছে এটি পরিষ্কার, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করাই সঠিক সিদ্ধান্ত। স্টারমার বলেন, ‘‘এটি বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এটি আমাদের সন্তানদের আরও নিরাপদ ও সুখী করবে, তাদের আরও বেশি সময় ও নিরাপত্তা, বড় হয়ে ওঠার জন্য আরও স্বাধীনতা এবং আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে দেবে।’’

তবে দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা এই ঢালাও নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। স্টারমার নিজেও স্বীকার করেছেন, এই ধরনের বিধিনিষেধ পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হবে।

এক মুসলিম গণিতবিদের নাম যেভাবে বদলে দিল আধুনিক প্রযুক্তি

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬
এক মুসলিম গণিতবিদের নাম যেভাবে বদলে দিল আধুনিক প্রযুক্তি

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো অ্যালগরিদম শব্দের ইতিহাস। আমরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি, তথ্য অনুসন্ধান করি, ভিডিও দেখি কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করি। এসব ক্ষেত্রেই অদৃশ্যভাবে কাজ করে অ্যালগরিদম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বহুল ব্যবহৃত শব্দটির শিকড় লুকিয়ে আছে এক মুসলিম গণিতবিদের নামের মধ্যে। অ্যালগরিদম শব্দের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় বারোশ বছর আগের ইসলামি জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগে, যেখানে একজন অসাধারণ মনীষীর অবদান আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

বর্তমান সময়ে অ্যালগরিদম শব্দটি শুধু প্রযুক্তি নয়, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কোন সংবাদ দেখব, কোন ভিডিও আমাদের সামনে আসবে কিংবা কোন বিষয়ে আগ্রহী হব—এসব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে অ্যালগরিদম। অনেকের কাছে অ্যালগরিদম এখন রহস্যময় একটি ধারণা। কেউ কেউ এটিকে মানুষের চিন্তা ও মতামত নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবেও দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অ্যালগরিদম মূলত কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য ধাপে ধাপে সাজানো নির্দেশনার সমষ্টি।

এই ধারণার পেছনে যিনি সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন, তিনি হলেন মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি। তার নাম থেকেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ভাষাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে অ্যালগরিদম শব্দটি।

কে ছিলেন আল-খাওয়ারিজমি?
মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি ছিলেন নবম শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী। তিনি শুধু গণিতবিদই ছিলেন না; একই সঙ্গে ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ এবং গবেষক। তার জন্ম বর্তমান উজবেকিস্তানের আরাল সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত খাওয়ারিজম অঞ্চলে। তার নামের শেষাংশ “আল-খাওয়ারিজমি” এসেছে জন্মস্থানের নাম থেকে। সে সময় ইসলামি সভ্যতার জ্ঞানচর্চা বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধ অবস্থানে ছিল। বাগদাদের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা চলত, আর আল-খাওয়ারিজমি ছিলেন সেই জ্ঞানবিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

গণিতশাস্ত্রে তার অবদান এতটাই গভীর ছিল যে, আধুনিক গণিত ও গণনাবিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণে তার কাজ আজও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

অ্যালগরিদম শব্দের জন্ম কীভাবে?
আল-খাওয়ারিজমির লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ পরবর্তীকালে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। তার নামের ল্যাটিন রূপ ছিল “আলগোরিতমি”। ইউরোপের পণ্ডিতরা তার গণনা পদ্ধতি ও গাণিতিক নিয়ম বোঝাতে এই নাম ব্যবহার করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে শব্দটি ভাষাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ পেতে থাকে। ল্যাটিন থেকে ফরাসি এবং পরে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করে এটি বর্তমান অ্যালগরিদম শব্দে পরিণত হয়।অর্থাৎ আজ আমরা যে শব্দটি প্রযুক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছি, সেটি আসলে একজন মুসলিম বিজ্ঞানীর নামের বিবর্তিত রূপ।

আল-খাওয়ারিজমির বিপ্লব
আল-খাওয়ারিজমির সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান তার গণিতবিষয়ক গ্রন্থ। সেখানে তিনি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানকে সহজ ধাপে ভাগ করে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, কোনো সমস্যাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করলে সমাধান পাওয়া সম্ভব। এই ধারণাই পরবর্তীকালে অ্যালগরিদমিক চিন্তার ভিত্তি হয়ে ওঠে। বর্তমান কম্পিউটার যেভাবে ধাপে ধাপে নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ সম্পন্ন করে, তার মূল দর্শনের সঙ্গে আল-খাওয়ারিজমির চিন্তার বিস্ময়কর মিল রয়েছে।

বীজগণিতের জনক হিসেবে পরিচিতি
বিশ্ব ইতিহাসে আল-খাওয়ারিজমিকে প্রায়ই বীজগণিতের জনক বলা হয়। তার গবেষণা বীজগণিতকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।তিনি সমীকরণ সমাধানের বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং গাণিতিক যুক্তিকে আরও সংগঠিত রূপ দেন। আধুনিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বীজগণিত পড়ানো হয়, তার শিকড়ও অনেকাংশে তার কাজের মধ্যে নিহিত। বিজ্ঞান ইতিহাসবিদদের মতে, তার কাজ ছাড়া আধুনিক গণিতের বিকাশ কল্পনা করা কঠিন।

শূন্য ও সংখ্যা পদ্ধতির প্রসারে ভূমিকা
আল-খাওয়ারিজমির আরেকটি বড় অবদান হলো হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতির প্রসার। তিনি এমন এক সংখ্যা পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করেন, যেখানে শূন্যের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশ যে সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করে, তার বিস্তারে আল-খাওয়ারিজমির ভূমিকা ছিল অনন্য। শূন্য ছাড়া আধুনিক গণিত, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব হতো। এই কারণে তাকে শুধু একজন গণিতবিদ নয়, বরং মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

অ্যালগরিদম আসলে কী?
সহজ ভাষায় অ্যালগরিদম হলো কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট ধাপের সমষ্টি। একটি সমস্যা সমাধানের জন্য কী করতে হবে, কোন কাজের পরে কোন কাজ হবে—এসব নির্দেশনা অ্যালগরিদমের অংশ। উদাহরণ হিসেবে রান্নার একটি রেসিপির কথা ভাবা যেতে পারে। প্রথমে উপকরণ প্রস্তুত করা, এরপর নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো, তারপর নির্দিষ্ট সময় রান্না করা—সবই ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। অ্যালগরিদমও ঠিক একইভাবে কাজ করে। পার্থক্য হলো, এটি মানুষ বা যন্ত্রকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেয়।

আধুনিক প্রযুক্তিতে অ্যালগরিদমের ব্যবহার
আজকের পৃথিবীতে অ্যালগরিদম ছাড়া প্রযুক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। অনুসন্ধান ব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন কেনাকাটা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি—সবখানেই অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হচ্ছে। আপনি যখন কোনো তথ্য খোঁজেন, তখন অ্যালগরিদম সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ফলাফল খুঁজে দেয়। আপনি যখন ভিডিও দেখেন, তখন আপনার আগ্রহ অনুযায়ী নতুন ভিডিও সাজিয়ে দেয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে হাজার হাজার অ্যালগরিদমিক নিয়ম।

পথনির্দেশনা থেকে মহাকাশ অভিযান
অ্যালগরিদম শুধু তথ্যপ্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি নৌপরিবহন, ব্যবসা, জরিপ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ নির্ণয়, যানবাহনের দিকনির্দেশনা এবং মহাকাশযানের পথ নির্ধারণেও অ্যালগরিদম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের চাঁদে যাত্রার পেছনেও বিভিন্ন অ্যালগরিদমিক গণনা কাজ করেছে। ফলে এটি মানবসভ্যতার অগ্রগতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অ্যালগরিদম নিয়ে বিতর্ক কেন?
যদিও অ্যালগরিদম মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তবুও এটি নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম অনেক সময় ব্যবহারকারীদের একই ধরনের মতামত ও তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। এর ফলে মানুষ ভিন্নমত সম্পর্কে কম জানে এবং নিজস্ব বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি সমাজে বিভাজন বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে। তবে সমস্যা অ্যালগরিদমে নয়, বরং এর ব্যবহারের পদ্ধতিতে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে এটি মানবকল্যাণে বিশাল অবদান রাখতে পারে।

উপসংহার
অ্যালগরিদম শব্দের ইতিহাস আমাদের শুধু একটি শব্দের উৎপত্তির গল্প শোনায় না, বরং মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতাও তুলে ধরে। নবম শতাব্দীর মুসলিম বিজ্ঞানী আল-খাওয়ারিজমির গবেষণা আজকের ডিজিটাল বিশ্বের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে আমরা যে প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাস করছি, তার পেছনে রয়েছে শত শত বছরের জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবন।

অ্যালগরিদম সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই যখনই আমরা অ্যালগরিদম শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন অজান্তেই স্মরণ করি একজন মহান মুসলিম গণিতবিদের অসাধারণ অবদানকে, যিনি তার সময়কে অতিক্রম করে আজও বিশ্বকে পথ দেখিয়ে চলেছেন।

পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ

প্রকাশ: শুক্রবার, জুন ০৫, ২০২৬
পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ

আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ রূপান্তরের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি ক্রয়ে কোনো ধরনের অফলাইন বা ম্যানুয়াল (কাগজে-কলমে) দরপত্র আহ্বান করা যাবে না। দেশের ক্রয় খাত সংস্কারের যাত্রায় এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়া ১ জুলাই, ২০২৬ এর আগে ম্যানুয়ালি শুরু হলে সেই প্রক্রিয়ার বাকি ধাপগুলো ম্যানুয়ালি চলতে পারে। তবে ওই তারিখের পর নতুন কোনো অফলাইন টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুমোদিত হবে না। ই-জিপি ব্যবহার থেকে অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদনও ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পর আর অনুমোদিত হবে না।

তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

সরকারি ক্রয়: একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সুশাসনে সরকারি ক্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ সরকারি ক্রয়ে ব্যয় হয়। তাই জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং সেবা প্রদানের মান বাড়াতে এই খাতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।

ক্রয় ব্যবস্থাপনা জোরদার করার লক্ষ্যে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে, যা ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা হয়। এর পাশাপাশি, পিপিআর-২০০৮-এর পরিবর্তে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ক্রয় ব্যবস্থায় একটি ব্যাপক সংস্কার হয়েছে।

ই-জিপি: ক্রয় খাত সংস্কারের মেরুদণ্ড
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের অধীনে সবচেয়ে যুগান্তকারী সংস্কারগুলোর অন্যতম হলো সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রমে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা। ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত এই ই-জিপি ব্যবস্থা দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে চুক্তি সম্পাদন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া—অর্থাৎ সম্পূর্ণ ক্রয় চক্রকে ডিজিটালাইজড করার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাধ্যতামূলক ই-জিপি বাস্তবায়নের এই পদক্ষেপের ফলে ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতির দরপত্রের সাথে জড়িত দীর্ঘদিনের বহু সমস্যা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কাজের দীর্ঘসূত্রতা, স্বচ্ছতার অভাব, মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের সুযোগ।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সংস্কারের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি:
দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের গড় সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পিপিআর, ২০২৫ বাস্তবায়নের আগে যেখানে দরপত্র প্রতি গড় দরদাতার সংখ্যা ছিল মাত্র ২.২ জন, সেখানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪ জনে।

ই-জিপি নিবন্ধনের জোয়ার:
নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর দৈনিক ই-জিপি নিবন্ধনের আবেদন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি আবেদন জমা পড়ত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টিতে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তারাও এখন সরকারি ক্রয়ে ক্রমবর্ধমান হারে অংশ নিচ্ছেন। বর্তমানে ই-জিপি সিস্টেমে ৭ হাজার ৪০৮ জন নারী দরদাতা নিবন্ধিত রয়েছেন, যার মধ্যে পিপিআর, ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭ জন।

মূল্যের যৌক্তিকতা বৃদ্ধি:
নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কাজের ক্রয়ের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের সাথে দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্যের গড় পার্থক্যের হার ঋণাত্মক ১০ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। মূল্যের এই উন্নতি অস্বাভাবিক কম মূল্যে দরপত্র দাখিলের আশঙ্কা বা উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করেছে।

‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫’ এ ১৫৪টি বিধি এবং ২১টি তফসিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে একটি সাধারণ প্রশাসনিক কাজের পরিবর্তে কৌশলগত সুশাসনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সংস্কারগুলো হলো: জাতীয় কাজের ক্রয়ে ১০ শতাংশ মূল্যসীমা বাতিল করে বাজারভিত্তিক মূল্য নিশ্চিতকরণ; সব ধরনের সরকারি ক্রয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ই-জিপি ব্যবহার; চুক্তি সম্পাদনকারী বা কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার তথ্য প্রকাশ; টেকসই সরকারি ক্রয় (এসপিপি) প্রবর্তন; ক্রয় কৌশল ও প্রাথমিক বাজার সম্পৃক্ততা; ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি ও দর-কষাকষি প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ; নারী, ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালন ক্রয় বাজেটের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ; প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ‘ক্রয় ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা এবং ভৌত সেবাকে ক্রয়ের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ই-জিপির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি
২০১১ সালে দেশে ই-জিপি ব্যবস্থা চালুর পর থেকে সরকারি ক্রয়ে অভূতপূর্ব দক্ষতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়ের গড় সময়সীমা কমে ৫৪ দিনে নেমে এসেছে। মূল দরপত্রের বৈধতার মেয়াদের মধ্যেই ৯৯ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি এবং কার্যাদেশ বা চুক্তি অনুমোদনের তথ্য শতভাগ অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে। এই অর্জনগুলো দেশের ক্রয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ
ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও দরদাতাদের দক্ষতার অভাব, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক দুর্বলতা এবং আচরণগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া টেকসই করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত যোগাযোগ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

আগামীর পথচলা
বিপিপিএ’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, নীতি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্রয় ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি) জাতীয় পর্যায়ে ক্রয় প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নের উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সার্বিকভাবে যেভাবে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ক্রয় ব্যবস্থায় রূপান্তর হচ্ছে, তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়, বরং স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক সংস্কার।

বিপিপিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শতভাগ ই-জিপি বাধ্যতামূলক এবং সম্পূর্ণ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে ডিজিটাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রূপান্তরের অন্যতম অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি ক্রয় সংস্কারের বিভিন্ন অর্জন টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের আগে তাদের জন্য ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিপিপিএ সিইও আরও জানান, প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি)-কে ভবিষ্যতে একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকারি ক্রয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত সকল অংশীজনদের সমন্বিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।